বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করেই আমাদের স্বাধীনতা: প্রধানমন্ত্রী

latest news জাতীয়

ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি : ‘বিশ্ব মানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’ এই বাণী মনে ধারণ করে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে তিন দিনের আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন। আজ শনিবার বিকেলে ৪টায় একাডেমির ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলা ভাষার ওপর নানা সময়ে কতভাবে আক্রমণ হয়েছে। সেই আক্রমণ বারবার প্রতিহত করা হয়েছে। এই উপমহাদেশে একমাত্র বাংলাদেশই একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র। বাংলা ভাষাকে ভিত্তি করেই আমাদের স্বাধীনতা।’

এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাহিত্যচর্চা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। যে সমাজে সাহিত্য যত ঋদ্ধ, সে সমাজ তত আধুনিক।’ নিজেকে সাধারণ মানুষ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশকে উন্নত করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে বাঙালি বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বে অনেক মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। সেটি যেন না হয়, এ জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট করেছি। সারা বিশ্বের মাতৃভাষা সেখানে সংরক্ষণ হবে, সেসব ভাষা নিয়ে গবেষণা হবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলা অক্ষর পরিবর্তনেরও চেষ্টা করা হয়েছিল। আরবি হরফে বাংলা লিখতে হবে। আমাদের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী কেউ মানেনি। রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব এলো, সেটাতেও বাধা দিয়েছি। রবীন্দ্রনাথ পড়া যাবে না, সেই সমন জারি করলো মোনায়েম খান। ছাত্রসমাজ আবারও আন্দোলন শুরু করলো।’

ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা ও নেতৃত্ব নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৫২ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি ছিল প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট ঘোষণার দিন। সে সময় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল। তখনকার ছাত্রসমাজ সেটি ভাঙার কারণে গুলিতে শহীদ হন ছাত্রনেতারা।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘‘পাকিস্তান নামের দেশটাতে আমরা ছিলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার সবসময়ই চেষ্টা করা হয়েছে। নজরুলের বিখ্যাত কবিতায় ‘মহাশ্মশান’ এর জায়গায় ‘গোরস্তান’ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’ এটাকে বদলে ‘ফজরে উঠিয়া আমি দেলে দেলে বলি’ বানানোর চেষ্টা হলো। বাংলা সাহিত্যকেও তখন কলুষিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।’’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি একজন সাধারণ মানুষ। যেহেতু আমার পিতা দেশ স্বাধীন করে গেছে, আমি সব সময় মনে করি আমার এই দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে হবে। যাতে বাঙালিরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে পারে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে জনগণই সব শিল্প সাহিত্যের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্যুত হয়ে কোনদিন মহৎ সাহিত্য শিল্প তৈরি হতে পারে না। আমি সারা জীবন জনগণকে সাথে নিয়ে সংগ্রাম করেছি। ভবিষ্যতে যা কিছু করবো জনগণকে নিয়েই করবো।’ এটাই বাস্তবতা, যা কাজ সব জনগণের জন্য, জনগণের কল্যাণে, জনগণের মঙ্গলের জন্য। সেই দায়িত্বটাই পালন করার চেষ্টা করছি জাতির পিতার নির্দেশ অনুযায়ী। আমাদের এই ঋদ্ধ ভাষায় যারা সাহিত্য চর্চা করছেন তাদের একত্রিত করার উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যখন জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমি সরকার গঠন করার পরে যতবার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছি, প্রতিবারই বাংলায় ভাষণ দিয়েছি। আমি গর্ববোধ করি বাংলায় ভাষণ দিতে। এটা ঠিক যুগের পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। সভ্যতার চাপে মাতৃভাষা হারিয়ে যাক এটা আমরা কখনো চাই না। আজকের এই সাহিত্য সম্মেলন ভাষা সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষকে আরও সচেতন করবে।

তিনি এ ধরনের একটি আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য আরও ঋদ্ধ হবে। নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত করার পাশাপাশি নিজেদের সামর্থ্যকে তুলে ধরবে।’

এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের ২২৫ জন শিল্পী-সাহিত্যিক। নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের সহযোগিতায় সম্মেলনের আয়োজন করছে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদ। আগামী সোমবার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি।

সম্মেলনে বিষয়ভিত্তিক সেমিনারের সঙ্গে দুটি মঞ্চনাটক ও সঙ্গীত, গল্প ও কবিতাপাঠ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আবৃত্তি অনুষ্ঠান রয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত বই ও লিটল ম্যাগাজিনের বিক্রয়, প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও থাকছে।

শনিবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে প্রথম দিনের আয়োজন। একাডেমির বহিরাঙ্গণে প্রদর্শিত হবে দুই চলচ্চিত্র ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ ও ‘পদ্মা নদীর মাঝি’।

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চস্থ হবে ম্যাড থেয়েটারের নাটক ‘নদ্দিউ নতিম’। এ ছাড়া সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ ও ভারতের কবি-সাহিত্যিকদের প্রীতি সম্মেলন। সন্ধ্যা ৬টায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ছোটগল্প’ শীর্ষক আলোচনা। এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেবেন পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার।

দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলা সাহিত্যে দেশ ভাগের অভিঘাত’, ‘সাহিত্য ও চলচ্চিত্র’, ‘বাংলা সংবাদ ও সাময়িকপত্রের ২০০ বছর’ ও ‘সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসের গতি ও গন্তব্য’ শীর্ষক চারটি সেমিনার। একই দিন বিকেলে রবীন্দ্র চত্বরে কবিতাপাঠের সঙ্গে আবহমান বাংলা গানের সুরে শ্রোতা-দর্শকদের হৃদয় রাঙাবেন দুই দেশের কবি-শিল্পীরা।

সম্মেলনের শেষ দিনে রয়েছে তিনটি সেমিনার- ‘ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতিসত্তা’, ‘অনুবাদের সাহিত্য, সাহিত্যের অনুবাদ’ ও ‘প্রযুক্তির বিশ্বে সাহিত্যের সংকট ও সম্ভাবনা’। ওইদিন বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও ভারতের বরেণ্য চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী।

সভাপতিত্ব করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

শেয়ার করুন